You are currently viewing নাথ ও মর্সিয়া সাহিত্যঃ সৌপ্তিক রায়

নাথ ও মর্সিয়া সাহিত্যঃ সৌপ্তিক রায়

নাথসাহিত্য: 

এই দেশে প্রাচীন কাল হতে এক সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করতো যারা নিজেদের নাথ সম্প্রদায়ের মানুষ বলে পরিচয় দিতো। এরা মূলত শিবের উপাসক। নাথ-যোগী ও সিদ্ধাচার্যদের রচিত সাহিত্যই নাথ সাহিত্য নামে পরিচিত। এই সাহিত্যের ব্যাপকতা হাজার বছরেরও বেশি। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর মতে নাথ পন্থ বৌদ্ধ মহাযানপন্থীদের শূন্যবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত। অর্থাৎ নাথ ধর্ম বৌদ্ধ ধর্ম ও হিন্দু ধর্মের এক মিশ্র রূপ। নাথ ধর্মের অনুসারীরা মনে করতেন, অবিদ্যা ও অজ্ঞানতা মানুষের তত্ত্বজ্ঞানের প্রধান অন্তরায়। তাই এই অজ্ঞতা দূর করে মহাজ্ঞান লাভের মাধ্যমে কামনা বাসনা ক্ষয় করাই নাথপন্থীদের প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল।

প্রকাশকাল:

নাথসাহিত্য অনেক প্রাচীন। ধারণা করা হয় নাথ সম্প্রদায়ের আদিগুরু মীননাথ বা মৎস্যেন্দ্রনাথের জীবনকাল চর্যাপদ রচনাকালেরও আগের। সেই হিসেবে এই সাহিত্য প্রাচীনযুগের নিদর্শন হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা হয়নি। কারণ, নাথ সাহিত্যের বিভিন্ন কাহিনি তখন শুধুমাত্র লোকমুখে প্রচারিত ছিল। অর্থাৎ চর্যাপদের আগেও যদি নাথ সাহিত্য সৃষ্টি হয়ে থাকে, সে সময় তা লিপিবদ্ধ হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, তুর্কি আক্রমণের পর যে সকল অন্ত্যজ শ্রেণির হিন্দু ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে, তারা তাদের হিন্দু জীবনের ঐতিহ্যরূপে নাথসাহিত্যের বিভিন্ন আখ্যায়িকা পরবর্তীকালে লিখিতভাবে সংরক্ষণ করেছিল। কিন্তু সে সাহিত্য নিদর্শনগুলো তাদের প্রাচীন নিজস্ব ভাষারূপ নিয়ে বর্তমান থাকেনি। তাই পুঁথিরূপে আবিষ্কৃত নাথসাহিত্যের ভাষা প্রাচীন নয় এবং এটি প্রাচীন যুগের নিদর্শনও নয়, বরং মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের নিদর্শন।

লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য:

নিজেদের ধর্মমতের প্রচার ঘটানোই ছিল নাথসাহিত্যের মূল লক্ষ্য। 

প্রধান চরিত্র:

আদিনাথ শিব, পার্বতী, মীননাথ, গোরক্ষনাথ, হাড়িপা, কাহ্নপা, ময়নামতি ও গোপীচন্দ্র নাথ সাহিত্যের প্রধান চরিত্র। 

নাথসাহিত্যের বিষয়বস্তু:

নাথসাহিত্য দুই ভাগে বিভক্ত। এক ভাগে রয়েছে সিদ্ধাদের ইতিহাস ও গোরক্ষনাথ কর্তৃক মীননাথকে নারীমোহ থেক উদ্ধার। আরেক ভাগে রয়েছে রানী ময়নামতি ও তার পুত্র গোপীচন্দ্রের কাহিনি। প্রথমটি গোরক্ষবিজয় এবং দ্বিতীয়টি ময়নামতির গান ও গোপীচন্দ্রের গান নামে পরিচিত। 

নাথসাহিত্যের কয়েকজন কবি ও তাঁদের রচনা:

শেখ ফয়জুল্লাহর ‘গোরক্ষবিজয়’, শ্যামদাস সেনের ‘মীনচেতন’, ভীমসেনের ‘গোরক্ষবিজয়’, ভবানীদাসের ‘ময়নামতির গান’, শুকুর মাহমুদের ‘গোপীচন্দ্রের সন্ন্যাস’। শেখ ফয়জুল্লাহ নাথসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি। 

  • শেখ ফয়জুল্লাহ ভারত পাঁচালী রচয়িতা কবীন্দ্র দাসের মুখে শুনে গোরক্ষবিজয় লিপিবদ্ধ করেন।
  • ‘মীনচেতন’ সম্পাদনা করেন- নলিনীকান্ত ভট্টশালী

মর্সিয়া সাহিত্য: 

‘মর্সিয়া’ শব্দটি আরবি ভাষা থেকে এসেছে। এর অর্থ শোক প্রকাশ করা। অর্থাৎ মর্সিয়া সাহিত্য মানে শোক সম্পর্কিত বিয়োগাত্মক ভাবধারার সাহিত্য। আরবি সাহিত্যে বিভিন্ন রকমের শোকাবহ ঘটনাকে পুঁজি করে মর্সিয়ার উদ্ভব হলেও পরবর্তীতে কারবালার প্রান্তরে নিহত ইমাম হোসেন ও অন্যান্য শহীদদের উপজীব্য করে লেখা শোককাব্য মর্সিয়া নামে বিখ্যাত হয়। আরবি সাহিত্যের মতো বাংলা সাহিত্যেও একই ভাবধারার এবং কারবালার শোকাবহ ঘটনা অবলম্বনে রচিত সাহিত্যকেই মর্সিয়া সাহিত্য বলে। মোগল আমলে শাসনকার্য উপলক্ষে শিয়া শাসক ও আমীর ওমরাগণ মুর্শিদাবাদ ঢাকা ও অন্যান্য অঞ্চলে এসে বসবাস স্থাপন করেন। তারাই এই সাহিত্যের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। মুর্শিদাবাদের নবাবের মনোরঞ্জনের জন্য অনেক কবিই মর্সিয়া রচনায় মনোনিবেশ করেন। 

ইংরেজ আমলে সৃষ্ট মর্সিয়া সাহিত্যকে চারটি ভিন্ন ধারায় বিভক্ত করা যায়। যথা- ক) মোগল আমলের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী মর্সিয়া সাহিত্য, খ) মুসলমানি বাংলায় রচিত মর্সিয়া সাহিত্য, গ) আধুনিক বাংলায় রচিত মর্সিয়া সাহিত্য এবং ঘ) লোক সাহিত্যে মর্সিয়া।

  • প্রথম কবি- শেখ ফয়জুল্লাহ (এ ধারায় প্রথম ‘জয়নবের চৌতিশা’ নামক কাব্য রচনা করেন) ।
  • অন্যান্য কবি- মুহাম্মদ খান (‘মক্তুল হোসেন’ কাব্য), শেখ সেরবাজ চৌধুরী (‘কাশিমের লড়াই’ কাব্য), হায়াত মামুদ (‘জঙ্গনামা’ কাব্য), দৌলত উজির বাহরাম খাঁ (‘জঙ্গনামা’ কাব্য), জাফর (‘শহীদ-ই-কারবালা’, ‘সখিনার বিলাপ’ কাব্য)। 
  • মর্সিয়া সাহিত্য ধারার একমাত্র হিন্দু কবি- রাধারমণ গোপ (‘ইমামগনের কেচ্ছা’ ও ‘আফৎনামা’ কাব্য) । 

লিখেছেন 

সৌপ্তিক রায় 

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় 

Leave a Reply